দুনিয়াদারের লোভ ও তার সাথে আযরাঈলের সাক্ষাৎ :- ভায়েরা আমার ! যারা দুনিয়ার মোহ ও ভোগ - বিলাসে লিপ্ত তারাই মৃত্যু থেকে গাফেল থাকে , মৃত্যুর পরের অবস্থা সম্পর্কে কোন ভ্রুক্ষেপই করে না । ফ্রান্সের এক তাবলীগী ভায়ের মুখে এর একটি দৃষ্টান্ত শুনেছিলাম তা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি । এক দুনিয়াদার ব্যক্তি তার মার্সিডিজ গাড়ীতে স্ত্রী , ছেলে , মেয়ে নিয়ে আনন্দ ভ্রমনে বেরিয়েছে , সাথে ভোজের খাদ্যদ্রব্য , ভোগ সামগ্রী সবই বিদ্যমান । গাড়ী চলছে , হঠাৎ গাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি বলতে লাগল গাড়ী থামাও , আমাকে তোমাদের সাথে নিয়ে যাও । দুনিয়াদার বলছে না গাড়িতে জায়গা নেই , তোমাকে নেয়া যাবে না । তখন পথিক বলল , আমাকে নিয়ে যাও এতে তোমার উপকার হবে । দুনিয়াদার জিজ্ঞাসা করল , তুমি কে ?
বলল , আমি টাকা বলল , আরে হা আমার টাকার প্রয়োজন । স্ত্রীকে বলল , তুমি পেছনে যাও আর টাকাকে বলল , তুমি আমার পাশে বস , তোমাকে আমার দরকার আছে । গাড়ী , চলল আবার কিছুক্ষণ যেতেই আরেক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ , বলছে ভাই আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও । বলল , না জায়গা নেই , নেয়া যাবে না । বলল , নিয়ে যাও এতে তোমার উপকার হবে । জিজ্ঞাসা করল , তুমি কে ? বলল , আমি রিয়াল দুনিয়াদার বলল , আরে আমার তো রিয়ালের প্রয়োজন আছে । টাকাকে পিছনে দিয়ে রিয়ালকে পাশে বসাল । অত : পর আবারো গাড়ী চলল কিছু যেতেই আবারো এক পথিকের সাথে সাক্ষাৎ বলল , ভাই আমাকে তোমাদের সাথে নিয়ে যাও , বলল না নেয়া যাবে না জায়গা নেই গাড়ী ভরপুর । বলল , নিয়ে যাওনা এতে তোমার উপকার হবে । জিজ্ঞাসা করল কে তুমি ? বলল , আমি ইউ এস ডলার । তখন দুনিয়াদার বলল আরে আমার তো ডলারের বড্ড প্রয়োজন আছে । এই তোরা পিছে যা , তাদেরকে আরো পিছনে দিয়ে ডলারকে পাশে বসালো । এবার গাড়ী আরো দ্রুত চলছে , একটু এগুতেই আরেক পথিকের সাথে সাক্ষাৎ । বলল , ভাই তোমাদের সাথে আমাকে নিয়ে যাও । একই কথা , জায়গা নেই প্রয়োজন নেই । বলল , নিয়ে যাও তাহলে লাভবান হবে , লোভীর চোখ ও মনের লোভ শেষ হয় না । জিজ্ঞাসা করল , তুমি কে ? বলল , আমি ইউরো , দুনিয়াদার চমকে বলল , আরে আমার তো তোমাকে যথেষ্ট প্রয়োজন । এই তোরা সব পিছে যা প্রয়োজনে বক্সে ঢুকে পড় তবুও আমাকে ইউরো নিতে হবে । পাশেই বসালো । বলল , তুমি তো আমার বন্ধু । এবার গাড়ী খুব স্পীডে চলল , দুনিয়ার সম্পদ মোটামোটি সবই আছে । কোন জিনিসের আর অভাব নেই , সাথে আর কিছুরই প্রয়োজন নেই , মনের আনন্দে গাড়ী চলল । একটু যেতে না যেতেই আওয়াজ আসল দাম, আমাকে সাথে নিয়ে যাও মালিক বলল, না ডিষ্টার্ব করো না । সময় নেই , জায়গাও নেই , নেয়া যাবে না । বলল , নিয়ে যাও না , এতে তুমি ভাল লাভবান হবে । জিজ্ঞাসা করলো তুমি কে ? বলল , আমি পাউন্ড । পাউন্ডের নাম শুনতেই ব্রেক করে বলল , আরে পাউন্ডের তো আমার সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন , তোমাকে তো আমি মনে মনে খুঁজছি , এই তোরা সব পিছে যা । যেভাবে হোক পাউন্ড আমাকে নিতে হবেই । এতক্ষণে স্ত্রী , ছেলে - মেয়ের সম্পর্কও কিছুটা লোপ পেয়েছে । কেননা , অতি সম্পদ মানুষকে অন্ধ আর বধির করে দেয় এবং স্ত্রী - সন্তানের মায়া কমিয়ে দেয় । পাউন্ডকে পাশে বসালো এবার গাড়ী চলল দিব্যি আরামে , মনের সুখে , কোন জিনিষের আর অভাব নেই , সবই যে আছে , বিধায় আর কারো জন্য গাড়ী থামবে না । একটু যেতেই আরেক পথিকের সাক্ষাৎ , আমাকেও তোমাদের সাথে নিয়ে যাওনা না কোন অবস্থাতেই নেয়া যাবে না । বলল , নিয়ে দেখনা লাভই হবে । জিজ্ঞাসা করল কে তুমি ? বলল , আমি দুনিয়া , গাড়ী থেমে গেল বলল , আমার দুনিয়ারও বড্ড প্রয়োজন আছে । তুমি না হলেই নয় , উঠ ! সব পিছনে ঠেলে দিয়ে তাকে পাশেই বসাল । এবার জীবনে আর কোন অভাব নেই , দু : খ নেই , চিন্তা নেই যা মানুষের জীবনে দরকার সবই বিদ্যমান আর কোন কিছুর প্রয়োজন নেই । এবার সুখ সাগরে পাড়ি জমাল ফুল স্পীডে গাড়ী চলল । আর গাড়ী থামবে না কাউকে উঠাবে না , মনের সুখে গাড়ী চলবে । কিছুক্ষণ অগ্রসর হতেই এক পথিক বলছে ভাই অনেক কিছুই নিলা আমাকেও নিয়ে যাও । গাড়ী থেকে আওয়াজ আসলো না না না জায়গা নেই , সময় নেই , আর কারো অবকাশ নেই । কিন্তু কে তুমি কি তোমার পরিচয় ? বলল , আমি নেক আমল , আমি তোমার আখেরাত তথা পরকালে কাজে আসব । দুনিয়াদার জবাব দিল , আরে রাখ আখেরাত , তা পরে দেখা যাবে আগে দুনিয়া ভোগ শেষ হউক । নেক আমলকে তুচ্ছ - তাচ্ছিল্য করে পথেই রেখে গেল , সাথে আর নেয়া হল না । গন্তব্য স্থলে পৌঁছেই দুনিয়ার ভোগ আর উপভোগে মত্ত হয়ে উঠবে এই নেশা ও আশায় দুর্বার গতিতে গাড়ী চলল । একটু এগুতেই বিশাল আকৃতির এক পথিক চিৎকার করে বলল , আরে থাম ! আমাকে নিয়ে যাও ! গাড়ী থেকে জবাব আসছে না ? দেখ গাড়ীতে একেবারেই জায়গা নেই , নেয়া যাবে না । পথ ছেড়ে দাও আমাদেরকে সুখ সাগরে পাড়ি দিতে দাও । অনেক দূরে যেতে হবে , সেখানে পৌঁছে বহু আশা ভরসা পুরা হবে । পথিক বলল , এক কদম এগুতে দেয়া হবে না । দুনিয়াদার বলল , আরে তোমার এত দাপট , আমার আর কোন জিনিষের প্রয়োজন নেই । সরে যাও আমার সবই আছে পথ ছাড় । পথিক নাছোড় বান্দা ! আমাকে নিয়ে যেতে হবে । না হয় তোমাকে আমি নিয়ে যাব । দুনিয়াদার , আরে আশ্চর্য সাহস দেখছি , কে তুমি ? তোমার এত বড় স্পর্ধা ? আমার সাথে দুনিয়ার সব সম্পদ আছে , এরপরও তুমি আমার সাথে এতবড় শক্তি দেখাচ্ছ । আচ্ছা বলতো দেখি , কে তুমি ? কি - ই বা তোমার পরিচয় ? পথিক এবার জোর গলায় বলল , আমি তোমার যমদূত আযরাঈল । এক্ষুনি তোমার জান কবজ করে নিয়ে যাবো । দুনিয়াদার , আরে তুমি আমাকে নিও না , এই দেখ টাকা থেকে শুরু করে দুনিয়া পর্যন্ত সব আমার সাথে আছে । তুমি যা চাও তাই তোমাকে দিয়ে দিব । প্রয়োজনে ছেলে , মেয়ে , স্ত্রীও নিয়ে যাও তবুও তুমি আমাকে নিও না । যমদূত বললো এগুলো আমার কোন প্রয়োজন নেই । তোমার জান এক্ষুনি আমি কবজ করছি , তবে জানতে চাই তোমার সাথে নেক আমল এনেছ কি ? তখন দুনিয়াদার বললো , আরে নেক আমল তো পিছনে রেখে এসেছি , একটু সুযোগ দাও এই তো তা নিয়ে আসছি । আযরাঈল ( আ :) বললো , আর এক মুহুর্তও সুযোগ দেয়া যাবে না । দুনিয়ার মোহে পরে পরকাল ও নেক আমলের কথা ভুলে গিয়েছিলে , এবার মজা বুঝবে । দুনিয়াতে তো ভোগ করা হলো না শুধু জমা - ই করলে । আর পরকালের কঠিন শাস্তি ও তিরস্কার তোমার জন্য অপেক্ষা করছে । এই বলে আযরাঈল গাড়ীতে সব রেখে তার জান কবজ করে নিয়ে যায় । সবই আপন আপন জায়গায় পড়ে রইল । কিন্তু তাকে সব ছেড়ে খালি হাতে চলে যেতে হল । ধোকা সবই ধোকা , দুনিয়াটা চোখের ভেলকির মত। (মাওয়ায়েজে সিরাজী-
৫ম পৃ:-৫১)
Comments
Post a Comment